সোমবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০

তোমাকে পাওয়ার জন্যে,হে স্বাধীনতা -শামসুর রাহমান

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
 

তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়? 

 

আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহন?
 

তুমি আসবে ব’লে,হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো, 

 

সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর।


তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে 



তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হল। 

 

রিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।


তুমি আসবে ব’লে,ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
 

তুমি আসবে ব’লে, বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার
ধ্বংসস্তুপে দাঁড়িয়ে একটানা চিৎকার করলো একটা কুকুর। 


তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতা- মাতার লাশের উপর। 

 

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খান্ডবদাহন? 



স্বাধীনতা, তোমার জন্যে থুত্থুরে এক বুড়ো
উদাস দাওয়ায় ব’সে আছেন- তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের 

 

দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।


স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাড়ির এক বিধবা দাড়িঁয়ে আছে 

 

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে 
ব’সে আছে পথের ধারে। 



তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্টদাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে
রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে
আর রাইফেল কাধেঁ বনে- জঙলে ঘুরে বেড়ানো 

 

সেই তেজী তরুণ
যার পদভারে একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ’তে চলেছে-
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা। 



পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি- প্রতিধ্বনি তুলে, 

 

নতুন নিশান উড়িয়ে,
 

দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায় 

 

তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।